ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত একশ বছর পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বৈপ্লবিক সময়। এই কালসন্ধিক্ষণ রচনায় অনেকের অবদান আছে, কিন্তু যদি মাত্র কয়েকজনের নাম বলতে হয় তাহলে চারজনের নামই সবার আগে মনে আসে: জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, লুডভিগ বোল্টস্‌মান, মাক্স প্লাংক এবং আলবার্ট আইনস্টাইন। বোল্টসমানের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটা চমৎকার বই লিখেছেন ইতালীয় গণিতবিদ কার্লো কের্চিনিয়ানি (১৯৩৯–২০১০), নাম Ludwig Boltzmann: The man who trusted atoms। ((Carlo Cercignani, 1998, Ludwig Boltzmann: The man who trusted atoms, Oxford University Press. With a foreward by Roger Penrose.)) এটা অনুসরণ করেই বাংলা উইকিপিডিয়া’র জন্য এই লেখাটি প্রথম লিখেছিলাম অনেকদিন আগে। উইকিপিডিয়াতে লেখাটি এখনো খসড়া অবস্থাতেই আছে, আর কেউ তাতে হাত দেয়নি। সেই পুরনো লেখাটাকেই ঘসে-মেজে ও খানিকটা পুনর্বিন্যস্ত করে মুক্তমনা’র জন্য তৈরি করলাম। কারণ লেখাটা বিশ্বকোষীয় ধাঁচের হলেও এর মধ্যে সুপাঠ্য ও আগ্রহোদ্দীপক কিছু উপাদান আছে বলে আমার বিশ্বাস।

=============================

এই কম্পিউটার আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যার যুগে বোল্টস্‌মানকে কেমন দেখাত? এঁকেছেন ভিয়েনা'র Bernhard Reischl।

এই কম্পিউটার আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যার যুগে বোল্টস্‌মানকে কেমন দেখাত? এঁকেছেন ভিয়েনা’র Bernhard Reischl।

লুডভিগ এডুয়ার্ড বোল্টস্‌মান প্রথম ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন, পরমাণুকে না দেখলেও কিছু পারিসাংখ্যিক সমীকরণের মাধ্যমে তাদের গতিবিধি বর্ণনা করা সম্ভব; এভাবেই তিনি পারিসাংখ্যিক গতিবিদ্যার জন্ম দেন। তখনকার গতানুগতিক চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে তিনি আরও বলেছিলেন, তাপগতিবিদ্যায় সম্ভাব্যতার ধারণা সংযোজন করা উচিত; এভাবে তার হাত ধরে পারিসাংখ্যিক তাপগতিবিদ্যারও জন্ম হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রকৃতির বিশৃঙ্খলাকে এনট্রপি নামক একটি গাণিতিক রাশির মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব। সে সময় প্রচলিত ধ্রুব প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকৃতির বাস্তব বিশৃঙ্খলা এবং সম্ভাব্যতার প্রভাব আবিষ্কার করেছিলেন বলেই তাকে বলা হয় দ্য জিনিয়াস অফ ডিসঅর্ডার। ((Ludwig Boltzmann: The genius of disorder. Enrico Agapito ও Petra Scudo এর তৈরি একটি প্রামাণ্য চিত্র।))

বোল্টস্‌মানের পিতামহ গটফ্রিড লুডভিগ বোল্টস্‌মান ১৭৭০ সালে জার্মানির রাজধানী বার্লিন থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এসে বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখানেই তিনি বিয়ে করেন, এবং ছেলের নাম রাখেন লুডভিগ গেয়র্গ বোল্টস্‌মান। গেয়র্গ বড় হয়ে অস্ট্রীয় সরকারের রাজস্ব বিভাগে যোগ দেন, এবং ১৮৩৭ সালে বিয়ে করেন সালৎসবুর্গের এক বণিকের কন্যা কাটেরিনা মারিয়া পাউয়েনফাইন্ডকে। উল্লেখ্য গেয়র্গ প্রোটেস্ট্যান্ট হলেও মারিয়া ছিলেন ক্যাথলিক মতের অনুসারী; গেয়র্গের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল না হলেও মারিয়ার বাবা ছিলেন খুবই ধনাঢ্য। তাদের পরিবারের নামানুসারে সালৎসবুর্গ শহরে এখনও Pauernfeindgasse এবং Pauernfeindstrasse নামে দুটি স্থান আছে।

গেয়র্গ ও মারিয়ার বড় সন্তান লুডভিগ বোল্টস্‌মানের জন্ম হয় ১৮৪৪ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে, অর্থাৎ শ্রোভ মঙ্গলবার এবং অ্যাশ বুধবারের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে। পরবর্তীতে তিনি মাঝেমধ্যে বলতেন, এমন একটা সময়ে জন্ম নেয়ার কারণেই তার আবেগ মূহুর্মূহু পরিবর্তিত হয়—তীব্র আনন্দের মধ্যে থেকেই আবার হঠাৎ তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হন। উল্লেখ্য অ্যাশ বুধবার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি বিশেষ দিন যা ইস্টারের ৪৬ দিন পর পালিত হয়; এই দিন থেকেই কঠোরভাবে ধর্মপালন শুরু হয় যা পরবর্তী ইস্টারের পূর্ব পর্যন্ত চলে। আর অ্যাশ বুধবারের আগের দিনটিই হচ্ছে শ্রোভ মঙ্গলবার।

বোল্টস্‌মানের জন্ম হয় ভিয়েনার তৃতীয় জেলা (গেমাইন্ডেবেৎসির্কে) লান্ডস্ট্রাসেতে। ১৮৪৬ সালে তার ছোট ভাই আলবার্ট এবং দুই বছর পর ছোট বোন হেডভিগের জন্ম হয়। তিন ভাইবোনেরই অপ্সুদীক্ষা হয় ক্যাথলিক ধর্মমত অনুসারে এবং তারা ক্যাথলিক হিসেবেই বেড়ে উঠতে থাকে। আলবার্ট মাধ্যমিক স্কুলে থাকার সময় নিউমোনিয়ায় মারা যায়।

বোল্টস্‌মানের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় বাড়িতে গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে। তার বাবাকে প্রথমে ভেল্স এবং পরে লিনৎস শহরে চলে আসতে হয়েছিল। লিনৎসেই বোল্টস্‌মান স্থানীয় জিমনেসিয়ামে পড়াশোনা শুরু করেন। স্কুলে সব সময়ই খুব ভাল করতেন; বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রতি তখন থেকেই তার খুব আগ্রহ ছিল। শেষ জীবনে তার চোখের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি ছোটবেলায় সন্ধ্যার পর মোমবাতি জ্বালিয়ে দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করাকে দায়ী করতেন। লিনৎসে তিনি আন্টোন ব্রুকনারের কাছে পিয়ানো বাজাতে শিখেন। অবশ্য শিক্ষক নিয়ে মায়ের অসন্তুষ্টির কারণে এক সময় তাকে পিয়ানো শেখা ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু নিজে নিজে পিয়ানো বাজানো কখনও ত্যাগ করেননি। বয়সকালে ছেলের সাথে বাজাতেন। ছেলে আর্টুর লুডভিগ বাজাত বেহালা আর তার সাথে তাল মিলিয়ে তিনি বাজাতেন পিয়ানো। ১৫ বছর বয়সে বোল্টস্‌মানের বাবা যক্ষ্ণায় মারা যান। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুও হয় এর কিছুকাল পর। এই দুটি মৃত্যু তার জীবনে বড় ছাপ ফেলেছিল।

ভিয়েনাতে শিক্ষাজীবন

১৯ বছর বয়সে বোল্টসমান ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ মাত্র ১৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডপলার ক্রিয়ার আবিষ্কারক, বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান ডপলার (১৮০৩-৫৪)। ভিয়েনা ছিল অস্ট্রিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, এবং সে সময় এটি যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। বোল্টস্‌মান যখন এখানে আসেন তখন আনড্রিয়াস ফন এটিংসহাউজেন সবেমাত্র পরিচালকের পদ ত্যাগ করেছেন, আর নতুন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন Joseph Stefan (১৮৩৫-৯৩)। বেশ কম বয়সেই স্টেফান পরিচালক হয়েছিলেন এবং পরে বিকিরিত তাপ ও তাপমাত্রার মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কারের জন্য অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ((যুক্তরাজ্যের বাইরে যে গুটিকয়েক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, কোন বল ক্ষেত্রের মাধ্যমে স্থানীয় ক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে তাদের মধ্যে স্টেফান একজন। তড়িচ্চুম্বকত্বের এই নতুন ধারণা দিয়েছিলেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।)) স্টেফান তার শিক্ষার্থীদের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কথাবার্তা বলতেন যে গুণটি বোল্টস্‌মানের খুব পছন্দ ছিল। স্টেফানের মৃত্যুর পর এক শোকবাণীতে তিনি লিখেছিলেন,

স্টেফানের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পরপরই সে আমার হাতে ম্যাক্সওয়েলের কিছু গবেষণাপত্র ধরিয়ে দেয়। আমি তখন ইংরেজি একেবারেই বুঝতাম না, এজন্য সে সাথে একটি ইংরেজি ব্যাকরণের বইও দিয়ে দেয়, আর একটি ইংরেজি অভিধান আমি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।

ভিয়েনাতে ভর্তি হওয়ার ৩ বছর পর বোল্টস্‌মান পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এর মধ্যেই তার দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তবে তার পিএইচডি গবেষণার কোনো অভিসন্দর্ভ ছিল না। কারণ ১৮৭২ সালের পূর্বে ভিয়েনায় পিএইচডি ডিগ্রির জন্য কোনো অভিসন্দর্ভ জমা দিতে হতো না।

১৮৬৭ সালে বোল্টস্‌মান ভিয়েনায় সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ছিল খুব ছোট, এর্ডবের্গারস্ট্রাসে-তে তাদের একটিমাত্র ছোট গবেষণাগার ছিল। কিন্তু ইনস্টিটিউটের সদস্য সবাই ছিলেন তুখোড়। এদের প্রশংসায় বোল্টস্‌মান লিখেছিলেন,

এর্ডবের্গ আজীবন আমার কাছে সৎ এবং উদ্যমী গবেষণার প্রতীক হয়েছিল। গ্রাৎসের ইনস্টিটিউটে যখন একটু প্রাণ সঞ্চার করতে পেরেছিলাম তখন তাকে আমি ছোট্ট এর্ডবের্গ নামে ডাকতাম। এর মানে এই নয় যে গ্রাৎসের সুযোগ-সুবিধা কম ছিল, বরং আকার-আয়তনে এটি ছিল স্টেফানের ইনস্টিটিউটের প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু এর্ডবের্গের সেই চেতনা এখানে তেমন ছিল না। এমনকি মিউনিখে পিএইচডি শিক্ষার্থীরা যখন আমাকে প্রশ্ন করত তারা কি নিয়ে কাজ করবে তখন আমি ভাবতাম, “এর্ডবের্গে সবকিছু কতটা ভিন্ন ছিল, বর্তমানে পরীক্ষণের জন্য সব যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু গবেষকদের মাথায় আইডিয়া নেই। আর তখন আমাদের মাথায় প্রচুর আইডিয়া ছিল, কিন্তু সেগুলো নিয়ে কাজ করার মত যথেষ্ট যন্ত্রপাতি ছিল না।

গ্রাৎসে অধ্যাপনা

১৮৬৮ সালে বোল্টস্‌মান শিক্ষকতায় কৃতিত্বের জন্য “ফেনিয়া লেগেন্ডি” পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৮৬৯ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে গ্রাৎস বিশ্ববিদ্যালয়ে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মনোনীত হন। সে সময় গ্রাৎস ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হতে চলেছিল। বোল্টস্‌মান এখানে আসার কিছুদিন পূর্বে স্থির-তড়িৎ গবেষণায় অবদানের জন্য বিখ্যাত আউগুস্ট ট্যোপলার (August Toepler) এখানকার পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক হয়ে আসেন। ট্যোপলার তার অন্যতম বন্ধু ও উপদেষ্টায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি প্রশাসনিক কাজেও খুব দক্ষ ছিলেন; কিছুদিনের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন ভবন, নতুন যন্ত্রপাতি এবং আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থার করেন। বোল্টস্‌মান গ্রাৎসে তাই গবেষণার খুব ভাল পরিবেশ পেয়েছিলেন। এর বদৌলতেই ১৮৭২ সালে ইম্পেরিয়াল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস এর (বর্তমান নাম Österreichische Akademie der Wissenschaften বা ‘অস্ট্রীয় বিজ্ঞান একাডেমি’) প্রসিডিংসে তার সবচেয়ে বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করতে সক্ষম হন। গবেষণাপত্রটির নামের বাংলা করলে দাঁড়ায় “গ্যাস অণুর তাপীয় সাম্যাবস্থা বিষয়ে নতুন গবেষণা।” ((L. Boltzmann (1872). Weitere Studien über das Wärmegleichgewicht unter Gasmolekülen. Sitzungsberichte der Akademie der Wissenschafien, Wien, II, 66, 275-370 [English translation in: S.G. Brush, Kinetic theory, Vol. 2, Irreversible processes, pp. 88-175, Pergamon Press, Oxford (1966)].)) ম্যাক্সওয়েল-বোল্টস্‌মান বণ্টনের প্রাথমিক রূপ এই লেখাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। এতে তিনি এমন একটি সমীকরণ প্রকাশ করেন যার মাধ্যমে অসংখ্য অণু দিয়ে গঠিত একটি গ্যাসের বিবর্তন ব্যাখ্যা করা যায়। উল্লেখ্য, এটিই প্রথম সমীকরণ যাতে সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে সময়ের সাথে কণার বিবর্তন দেখানো হয়েছিল।

সে সময় তাত্ত্বিক গবেষণার পাশাপাশি বোল্টস্‌মান গ্রাৎসে একটি পরীক্ষণও চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যার বিষয় ছিল প্রতিসরাংক এবং আপেক্ষিক প্রবেশ্যতা-র (relative permeability) মধ্যে সম্পর্ক। এই পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন ১৮৭৩ সালে। Johann Josef Loschmidt (১৮২১–৯৫) মারা যাওয়ার পর তার উদ্দেশ্যে লেখা শোকবাণীতে বোল্টস্‌মান লিখেছিলেন,

তখন আমি সালফার কেলাসের গোলক নিয়ে গবেষণা করতে চাচ্ছিলাম। কেউ যেহেতু এই কেলাস গুড়ো করতে চায় না সেহেতু লশমিট আমাকে পরামর্শ দিল বুর্গথেয়াটার এর টিকেট কেনার লাইনে দাঁড়িয়ে তার সাথে কাজটা করতে। এতে কার্বন ডাইসালফাইডের গন্ধে সবাই লাইন ছেড়ে পালাবে।

ট্যোপলার যথেষ্ট অর্থের সংস্থান করতে পেরেছিলেন বলেই বোল্টস্‌মান অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করতে যেতে পারতেন। সে সময় তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গে বিখ্যাত রসায়নবিদ Robert Bunsen (১৮১১–৯৯; বুনসেন বার্নার যার নামে) এবং গণিতজ্ঞ Leo Königsberger (১৮৩৭–১৯২১) এর সাথে কাজ করেন। বার্লিনে কাজ করেন Gustav Kirchhoff (১৮২৪–৮৭) এবং শক্তির নিত্যতার একটি সূত্র প্রদানের জন্য বিখ্যাত Hermann von Helmholtz (১৮২১–৯৪) এর সাথে। এরা সবাই সে সময় খুব বিখ্যাত ছিলেন। বোল্টস্‌মান হেল্মহোল্ট্‌স কে খুব পছন্দ করতেন। এমনকি অনেক সময় হেল্মহোল্টস ছাড়া তিনি কথা বলার মত আর কাউকে পেতেন না। তার সম্পর্কে একবার মা-কে লিখেছিলেন,

গতকাল আমি বার্লিন ফিজিক্যাল সোসাইটিতে বক্তৃতা করলাম। বুঝতেই পারছ, নিজেদের দেশকে ভালভাবে তুলে ধরতে আমি কতটা চেষ্টা করেছি। এজন্য গতকাল আমার মাথা ভর্তি ছিল কেবল সমাকলনীয় সমীকরণ… অবশ্য, এ নিয়ে খুব শ্রম দেয়ার প্রয়োজন ছিল না, কারণ আমার কথা এমনিতেও কেউ বুঝত না। কিন্তু, হেল্মহোল্টসও সেখানে উপস্থিত ছিল এবং সেই সূত্রে তার সাথে আমার একটি চমৎকার আলোচনার সূচনা ঘটে। তুমি তো জানোই আমি বৈজ্ঞানিক আলোচনা কত পছন্দ করি, তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ হেল্মহোল্টসের সাথে কথা বলে আমি কতটা আনন্দ পেয়েছিলাম। বিশেষ করে এইজন্য যে, অন্যভাবে সহজে হেল্মহোল্টসের নাগাল পাওয়া যায় না। সে আমার পাশের গবেষণাগারে কাজ করে, কিন্তু এর আগে ভাল করে একটু কথা বলারও সুযোগ পাইনি।

১৮৭৩ সালে বোল্টস্‌মান ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক পদে আমন্ত্রণ পান। ভিয়েনার অধ্যাপক হওয়া সে সময় অস্ট্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সম্মান বলে বিবেচিত হতো, এখনও হয়। অনেক সময় অবশ্য এতে হিতে বিপরীতও হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বোল্টস্‌মানের ভিয়েনায় যাওয়ার ব্যাপারে সম্ভবত আরেকটি ব্যাপার কাজ করেছিল—তিনি আরও পরীক্ষণমূলক কাজ করতে চাচ্ছিলেন। বোল্টস্‌মান পরিচিত ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে, কিন্তু ভিয়েনায় গণিত বিভাগে নিয়োগ দিতে গিয়ে সেখানকার নির্বাচকরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, তার গবেষণাপত্রগুলো গণিতের কাজ হিসেবেও চমৎকার, বিশেষত তাত্ত্বিক বলবিদ্যা এবং সম্ভাব্যতার ক্যালকুলাস নিয়ে তার কাজ প্রশংসা করার মত এবং তাপ নিয়ে কাজ করার সময়ও তিনি গণিতে বিশেষ পারদর্শীতা দেখিয়েছেন।

প্রণয় এবং ভিয়েনাবাস

গ্রাৎস ত্যাগ করার পূর্বেই বোল্টস্‌মানের সাথে তার ভবিষ্যৎ স্ত্রী Henriette von Aigentler এর পরিচয় হয়েছিল। সোনালী লম্বা চুল ও নীল চোখের এই তরুণী বোল্টস্‌মানের ১০ বছরের ছোট ছিলেন। হেনরিয়েটা’র বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন, তিনি থাকতেন গ্রাৎসের দক্ষিণে স্টাইনৎস মফস্বলের একটি বাড়িতে। এই বাড়ির কর্তা-কর্ত্রীর সন্তান ছিলেন নামকরা অস্ট্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ Wilhelm Kienzl। হেনরিয়েটা পেশায় শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু বোল্টস্‌মানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর আবার গণিত পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সে সময় মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চল ছিল না, তবে তা নিষিদ্ধও ছিল না। গ্রাৎসের দর্শন অনুষদের প্রধান অধ্যাপক হিরৎসেল বুঝে পাচ্ছিলেন না হেনরিয়েটা কেন গণিত পড়তে চায়। তিনি তার আর্জি শোনার পর বলেছিলেন, মেয়েদের কাজ রান্নাবান্না, ঘর-সংসার করা। তবে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়েই প্রথম সেমিস্টারের লেকচারগুলোর শোনার অনুমতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু দ্বিতীয় সেমিস্টারের শুরুর আগেই দর্শন অনুষদ মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ করে একটি আইন জারি করে। হেনরিয়েটা এই আইনের বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পিটিশন পেশ করেন। মন্ত্রণালয় থেকে তাকে পড়ার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু পরের সেমিস্টার শুরুর আগে আবারও সেই সমস্যার উদ্ভব ঘটে। অবশ্য বোল্টস্‌মানের সাথে বাগ্‌দান হওয়ার পর তার পড়াশোনার ইচ্ছা চলে যায়, অধ্যাপক হিরৎসেল যা বলেছিলেন তাই পালন শুরু করেন—রান্না শিখেন গ্রাৎসের লর্ড মেয়রের বাসায় যিনি তার বাবার বন্ধু ছিলেন।

১৮৭৩ সালেই বোল্টস্‌মান ভিয়েনায় চলে যান। ভিয়েনা থেকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন হেনরিয়েটাকে। বাগ্‌দানের পর বোল্টস্‌মানের সাথে তার হবু স্ত্রীর যেসব চিঠি আদান-প্রদান হয়েছিল সেগুলো নিয়ে জার্মান ভাষায় একটি বই বেরিয়েছে, যার ইংরেজি নাম Illustrious Professor: Dearly beloved Louis: Ludwig Boltzmann, Henriette von Aigentler, Correspondence। ((জার্মান নাম Hachgeehrter Herr Professor! Innig geliebter Louis! Ludwig Boltzmann, Henriette von Aigentler, Briefwechsel.)) বইটি সম্পাদনা করেছেন বোল্টস্‌মান ও হেনরিয়েটার পৌত্র অধ্যাপক Dieter Flamm। এই চিঠিগুলোতে বোল্টস্‌মানের জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য দিকের পরিচয় পাওয়া যায়। বইয়ের শিরোনাম থেকে দেখা যায় ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর হেনরিয়েটা লুডভিগকে কেবল “লুইস” বলে সম্বোধন করতেন। বোল্টস্‌মান প্রথমে তাকে “Hochgeehrtes Fraulein” নামে সম্বোধন করলেও পরে শুধু “ইয়েটি” (Jetty) ব্যবহার শুরু করেন।

বোল্টস্‌মান অবশেষে ১৮৭৫ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর হেনরিয়েটাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন চিঠির মাধ্যমে। এই চিঠি থেকে দেখা যায় তখনও ভিয়েনায় মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা ছিল। চিঠিতে তিনি নিজের আর্থিক অবস্থার বিবরণ দেন; ১৮৭৪ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ৫৪০০ ফ্লোরিন। দুই জনের জন্য এটা যথেষ্ট বলেই মনে হয়েছিল বোল্টস্‌মানের। কিন্তু চিঠিতে এও লিখেন যে, ভিয়েনায় দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে হেনরিয়েটার অবসর বিনোদন এবং আনন্দের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট হবে না। এছাড়া তিনি বিয়ে সম্পর্কেও তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে লিখেন,

পরিবারের সার্বিক দেখভাল একজন স্বামীর জন্য আবশ্যকীয় এবং এক্ষেত্রে তার একমাত্র মূলধন তার কর্ম। কিন্তু আমার মতে স্ত্রী যদি কেবল স্বামীর গৃহপরিচারিকা হয়ে থাকে, তার আনন্দ এবং উদ্যমগুলো ভাগাভাগি না করে বা বুঝতে না পারে, তার সাথে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করতে না পারে তাহলে ভালবাসা চিরস্থায়ী হতে পারে না।

২৫শে নভেম্বর হেনরিয়েটার লেখা আরেকটি চিঠি থেকে জানা যায় বোল্টস্‌মানকে সে সময় ফ্রেইবুর্গে একটি অধ্যাপনার পদে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। হেনরিয়েটা তার চিঠিতে এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দেননি। তিনি যেহেতু কেবল লুডভিগকেই চান সেহেতু তিনি ভিয়েনায় থাকবেন না ফ্রেইবুর্গে থাকবেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে এটুকু নির্লিপ্ততা দেখিয়ে তিনি আবার ভিয়েনা ছেড়ে যাওয়ার সুবিধা-অসুবিধার কথা বলেন, যেহেতু বোল্টস্‌মান তার পরামর্শ চেয়েছিলেন। সুবিধার মধ্যে তিনি বলেন, ফ্রেইবুর্গে পেশাদারী কাজ কম, স্ত্রী ও পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারবেন, একটি পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান হতে পারবেন। কিন্তু মূল অসুবিধা হচ্ছে, ফ্রেইবুর্গের বেতন ভিয়েনার প্রায় অর্ধেক, অবশ্য সেখানে খাবার খরচও ভিয়েনা থেকে কম, আর বাসার কোনো ভাড়া দিতে হবে না। বোল্টস্‌মানের পৌত্রের কাছ থেকে জানা যায় হেনরিয়েটা তাকে “Mein liebes dickes Schatzerl” (sweet fat darling) বলে ডাকতেন। জানা যায় বোল্টস্‌মান খুব নরম মনের মানুষ ছিলেন, স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে কোথাও যেতে হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারতেন না।

১৮৭৫ সালে বোল্টস্‌মানের প্রথম বিখ্যাত গবেষণাপত্র ((টীকা ৪ দ্রষ্টব্য। লশমিটের সমালোচনা এবং বোল্টস্‌মানের জবাব নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যাবে কের্চিনিয়ানি’র (টীকা ১ দ্রষ্টব্য) বইটির ৫ম অধ্যায়ে।)) অর্থাৎ ১৮৭২ সালের গবেষণাপত্রের মৌলিক সমীকরণটি (যা পরবর্তীতে ‘H-theorem’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে) তার বন্ধু লশমিটের সমালোচনার মুখে পড়ে। এ বিষয়ে লশমিটের বক্তব্য অপ্রত্যাবর্তন হেঁয়ালি বা লশমিটের হেঁয়ালি (Loschmidt’s paradox) নামে পরিচিত। বোল্টস্‌মান এই সমালোচনার জবাবও দিয়েছিলেন।

ভিয়েনায় প্রশাসনিক কাজ অনেক বেশি ছিল, নরম মনের বোল্টস্‌মানের পক্ষে সবকিছু চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। তার পুরোটা সময়ই চলে যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে। ১৮৭৬ সালেই তার গ্রাৎসে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়। তার বিয়েও হওয়ার কথা সে বছর। হেনরিয়েটা যেহেতু গ্রাৎসের মেয়ে এবং তিনি যেহেতু ভিয়েনায় উপযুক্ত বাসা খুঁজে পাচ্ছিলেন না সেহেতু বিয়ের পর গ্রাৎসে থাকাটাই তার জন্য সবচেয়ে ভাল ছিল। তাই সুযোগটির জন্য বোল্টস্‌মান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।

গ্রাৎসের পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সমৃদ্ধির পেছনে মূল অবদান ট্যোপলারের। নতুন ভবনও তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন। ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৬ এর মধ্যে ইনস্টিটিউটের জন্য ২৮,০০০ ফ্লোরিনের যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। কিন্তু ১৮৭৬ এ বোল্টস্‌মানকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, তিনি সরকারের কাছ থেকে যথেষ্ট অর্থ পাচ্ছেন না। সে বছরই তিনি গ্রাৎস ছেড়ে জার্মানির ড্রেসডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। এতে গ্রাৎসের পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধানের পদটি ফাঁকা হয়ে যায়। এই পদ বোল্টস্‌মানের কাছে ছিল স্বপ্নের মত। কিন্তু এতে তার একজন প্রতিদ্বন্দী ছিলেন যিনি আবার পেশাগত ক্ষেত্রেও ছিলেন বোল্টস্‌মানের বিরুদ্ধমনা। তার নাম আর্নস্ট মাখ। মাখ ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত গ্রাৎসের গণিত বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তার Die Mechanik in Hirer Enlwickelung historisch-kritisch dargestellt (ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টকোণ থেকে বলবিজ্ঞানের উন্নয়ন) নামক গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানীদের একেবারে নতুন একটি প্রজন্মের জন্ম দিয়েছিল যে প্রজন্মের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হচ্ছেন আলবার্ট আইনস্টাইন।

১৮৭৬ সালে মাখ প্রাগে ছিলেন, কিন্তু চাচ্ছিলেন গ্রাৎসে ফিরে যেতে। অন্যদিকে বোল্টস্‌মান ও হেনরিয়েটার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গিয়েছিল জুলাইয়ের ১৭ তারিখ। তখনও তিনি নিশ্চিত না বিয়ের পর তাকে ভিয়েনায় থাকতে হবে না কি গ্রাৎসে, বাসা কোথায় দেখতে হবে—ভিয়েনাতে নাকি গ্রাৎসে। নির্ধারিত তারিখের ৫ দিন পূর্বেই তারা বিয়ে করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে যেতে হবে হোক। কিন্তু এর পরপরই মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসে যে, গ্রাৎসের পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান মনোনীত হয়েছেন বোল্টস্‌মান। অবশেষে বিয়ে করে গ্রাৎসে থাকতে শুরু করে নবদম্পতি।

গ্রাৎসে প্রত্যাবর্তন

বোল্টস্‌মান দম্পতি গ্রাৎসে ১৪ বছর ছিলেন। এই শহরেই তাদের দুই ছেলে লুডভিগ হুগো (১৮৭৮-৮৯) ও আর্টুর (১৮৮১-১৯৫২) এবং দুই মেয়ে হেনরিয়েটা (১৮৮০-১৯৪৫) ও ইডা’র (১৮৮৪-১৯১০) জন্ম হয়। গ্রাৎস ছেড়ে যাওয়ার পর তাদের তৃতীয় মেয়ে এলসা’র (১৮৯১-১৯৬৬) জন্ম হয়। অবশ্য গ্রাৎসে থাকার সময়ই বোল্টস্‌মানের মা মারা যান, ১৮৮৫ সালে। এই মৃত্যুটি ছাড়া গ্রাৎসে তার জীবন ছিল সুখের। এ সময় অস্ট্রিয়ার অনেক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পান তিনি। প্রকৃতি সম্পর্কে তার পারিসাংখ্যিক মনোভাবকে শাণিতও করেন এখানে। অস্ট্রীয় সরকার তার প্রশাসনিক কাজগুলো করে দেয়ার জন্য গ্রাৎসে Extraordinarius (সহযোগী অধ্যাপক) নামে একটি পদ তৈরি করে তাতে Arthur von Ettingshausen কে (১৮৫০-১৯৩২) মনোনয়ন দেয়।

১৮৭৮ সালে বোল্টস্‌মান অনুষদের প্রধান হন। ১৮৮১ সালে সরকারী কাউন্সিলর এবং ১৮৮৫ তে ইম্পেরিয়াল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের সদস্য হন, এবং ১৮৮৯ সালে কোর্ট কাউন্সিলর হন। অন্যান্য দেশ থেকেও তাকে অনেক সম্মাননা দেয়া হয়। পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি গ্রাৎসে আরেকটি পদ ছিল, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের চেয়ার। প্রথমবার যখন গ্রাৎসে ছিলেন তখন এই পদ বোল্টস্‌মানের ছিল। কিন্তু এবার এই পদে থাকেন আরেক অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী Heinrich Streinz। স্ট্রাইনৎসের ক্যারিয়ার খুব বেশি সফল ছিল না, কিন্তু বোল্টস্‌মান সব সময় তাকে সহায়তা করেছেন। এ সময় বোল্টস্‌মানকে রাজকীয় উপাধি দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে রাজপরিবার। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, তার জন্য তার মধ্যবিত্ত পরিবারের উপাধিই ভাল এবং তার সন্তান ও তাদের বংশধরদের জন্যও আশাকরি সে উপাধিই যথেষ্ট হবে।

এ সময়টা বোল্টস্‌মানের জন্য খুব ব্যস্ততারও ছিল না। তাকে সাহায্য করার জন্য ছিলেন এটিংসহাউজেন। অনুষদের প্রধান হিসেবেও খুব বেশি কিছু করতে হতো না, ব্যস্ত থাকলে উপ-প্রধানকে দায়িত্ব দিতে পারতেন। তাই সে সময়কার বিখ্যাত সব পদার্থবিজ্ঞানীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পেরেছিলেন। এদের মধ্যে রয়েছেন Hendrik Lorentz, হেল্মহোল্টস, Wilhelm Ostwald, এবং কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ অধ্যাপক পদে ম্যাক্সওয়েলের উত্তরসূরী John William Strutt। এ সত্ত্বেও তার সে সময়কার চিঠি পড়ে মনে হয়, তিনি ভাবতেন তিনি বিজ্ঞানীদের মূল গোষ্ঠীর বাইরে আছেন, ভেতরে থাকলে আরও আলোচনা করতে পারতেন। অবশ্য তিনি ট্যোপলারকে এও বলেছিলেন যে, বিয়ে মানুষকে অলস করে দেয়, যতটা ভেবেছিলেন তার চেয়েও বেশি। এ কারণেই বোধহয় ইনস্টিটিউটের প্রধান পদে তার উত্তরসূরী Leopold Pfaundler বলেছিলেন, তিনি এসে দেখেন ইনস্টিটিউটের ভবনটি শূকরের খামাড় হয়ে আছে। বোঝাই যায়, গবেষণার চাপে হয়ত বোল্টস্‌মান ইনস্টিটিউটের দিকে খুব একটা নজর দিতে পারেননি।

১৮৭৭ সালে বোল্টস্‌মান দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার একটির আলোচ্য বিষয়ে ছিল এনট্রপি। এতে তিনি পরমাণুর বিশৃঙ্খলার গাণিতিক পরিমাপ হিসেবে এনট্রপি ব্যবহার করেছিলেন। বিকিরণ চাপ নিয়ে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী Adolfo Bartoli-র গবেষণা থেকে খুব অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি। এই অনুপ্রেরণায় ১৮৮৬ সালে তার শিক্ষক ইয়োসেফ স্টেফানের সূত্রের একটি অনন্যসাধারণ প্রমাণ আবিষ্কার করেন। একই বছর তার আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় যাতে তিনি মিথস্ক্রিয়ারত এবং বিভব শক্তিবিশিষ্ট গ্যাসীয় অণু নিয়ে আলোচনা করেন। এই গবেষণাপত্র খুব একটা পরিচিত না হওয়ায় অনেক বিজ্ঞানী এখনও মনে করেন বোল্টস্‌মান কেবলই আদর্শ গ্যাস নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু এটি দেখলে মনে হয়, Josiah Willard Gibbs নয় বরং বোল্টস্‌মানকেই সাম্যাবস্থার পারিসাংখ্যিক বলবিদ্যার জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা উচিত।

১৮৮৬ সালে Heinrich Hertz এর তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো বিষয়ক গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি নিজেই হের্ট্‌সের পরীক্ষাটি পুনরায় করার চেষ্টা করেন। উল্লেখ্য ম্যক্সওয়েল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো একই, যা হের্টস প্রমাণ করেন। এ বিষয়ে বোল্টস্‌মানের গবেষণা গ্রাৎস ত্যাগের পূর্বে তার শেষ প্রকাশিত লেখাগুলোতে লিপিবদ্ধ আছে। গ্রাৎসে থাকার সময় তার চরিত্রের একটি লক্ষ্যণীয় দিক হচ্ছে, এ সময় তিনি বিজ্ঞান এবং সাধারণ অর্থে জ্ঞানের দার্শনিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকতেন। ১৮৮৭ সালের একটি গবেষণাপত্রে বোল্টস্‌মান তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেন।

বেশ স্বল্প সময়ের মধ্যেই গ্যাসের গতীয় তত্ত্ব বিষয়ে বোল্টস্‌মানের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে, পরিচিত হয়ে উঠে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত এইচ ডব্লিউ ওয়াটসনের বইয়ে যাতে তিনি গ্যাসের গতি তত্ত্ব ব্যাখ্যায় বোল্টস্‌মানের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ১৮৮২ সালে লেখা ম্যাক্সওয়েলের একটি জীবনী গ্রন্থে তাকে গ্যাসের গতি তত্ত্বের জনকদের একজন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল ১৮৮৫–১৮৮৭ সালের মধ্যে দুজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর (পিটার টেইট এবং উইলিয়াম বার্নসাইড) সাথে তার বিতর্ক। বোল্টস্‌মানের গবেষণাপত্রগুলো অনেক দীর্ঘ হওয়ায় সবাই সেগুলো পড়ার ধৈর্য্য রাখত না। তাই এই আলোচনাগুলো তাকে ইংরেজভাষী বিশ্বে পরিচিত হতে সাহায্য করেছিল। এরপর বিশ্বের নানা দিক থেকে তার জন্য পুরস্কার ও সম্মাননা আসতে থাকে। গ্রাৎসের এই ১৪ বছরে তিনি পৃথিবীর সেরা পদার্থবিজ্ঞানীদের একজনে পরিণত হন।

অসুস্থতার পূর্বসূত্র

বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার পরই ১৮৮৮ সালের জানুয়ারি থেকে বোল্টস্‌মানের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। এত বিখ্যাত এবং ধিরস্থির একজন মানুষ কেন হঠাৎ এমন হয়ে গেলেন তার কোনো সুস্পষ্ট কারণ জানা যায় না। তবে বেশ কিছু ঘটনাকে তার পূর্বসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা যায়। খুব বেশি হতাশা এবং উদ্বিগ্নতায় ভোগা এবং খুব নরম মনের মানুষ হওয়ার কারণেই সম্ভবত তার উপর এই ঘটনাগুলো এতটা প্রভাব ফেলেছিল। বোল্টস্‌মানের জীবনীকার Carlo Cercignini পূর্বসূত্র হিসেবে যে ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলোই এখানে বর্ণনা করছি।

ঘটনার সূত্রপাত ১৮৮৫ তে। এই বছর তার মা মারা যান। ৪১ বছর বয়সে মা-কে হারানো অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বোল্টস্‌মান ১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন এবং সে কারণে মা’র প্রতি তার আকর্ষণ একটু বেশিই ছিল। উল্লেখ্য এই বছর তিনি কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেননি এবং কোন চিঠি লিখেছেন বলেও জানা যায়নি।

পরবর্তী ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত। বোল্টস্‌মান ছিলেন গ্রাৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনের দায়িত্ব ছিল তার উপর। এমন দায়িত্বের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। এর মধ্যে আবার ১৮৮৭ সালের ২২শে নভেম্বর গ্রাৎসের জার্মানিপন্থী ছাত্ররা একটি আবাসিক ভবন থেকে অস্ট্রিয়ার রাজার মূর্তি সরিয়ে নেয় এবং Habsburg রাজপরিবারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকে। রেক্টর হিসেবে এই পরিস্থিতি সমাধানের দায়িত্ব ছিল বোল্টস্‌মানের উপর এবং স্টিরিয়া প্রদেশের গভর্নর, ভিয়েনার প্রশাসন এবং স্বয়ং রাজা তার উপর ভরসা করে ছিলেন। এই বিদ্রোহ ৪ মাস স্থায়ী হয়েছিল।

এদিকে ১৮৮৭ সালের ১৭ই অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে বোল্টস্‌মানের বন্ধু গুস্টাফ কির্শফ মৃত্যুবরণ করেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি এ বছরের শেষ দিকে বার্লিনে যান, এবং সেখানে তাকে কির্শফের পদে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মানে তিনি হতে পারবেন কির্শফের উত্তরসূরী এবং হেল্মহোল্টসের সহকর্মী। তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং এমনকি ইনস্টিটিউটে তার কক্ষও ঠিক করে ফেলেন। কিন্তু, ১৮৮৮ সালের মার্চে আবার তিনি পদটি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান, যদিও ততদিনে জার্মানির রাজা Kaiser Wilhelm I চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ফেলেছিলেন। এর কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, জার্মানিতে চাপ গ্রাৎসের চেয়ে অনেক বেশি ছিল কিন্তু বোল্টস্‌মান চাপ পছন্দ করতেন না। তবে কারণ আরও রয়েছে। বোল্টস্‌মানের সম্ভাব্য অস্ট্রিয়া ত্যাগের খবর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে গ্রাৎসে পৌঁছে যায়। এই সুযোগে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান স্ট্রাইনৎস নিজের অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবী জানান। ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে তার সহযোগী এটিংসহাউজেন Technische Hochschule (গ্রাৎসের তৎকালীন পলিটেকনিক) তে একটি পদে যোগ দেন। এতে নিজের বিভাগেই বোল্টস্‌মান সমর্থন ও সহযোগিতা হারান। গ্রাৎসে ফিরে বোল্টস্‌মান বুঝতে পারেন তিনি দুঃসাহসিকতা দেখিয়ে ফেলেছেন, অস্ট্রীয় রাজার অনুমতি না চেয়ে বার্লিনকে সম্মতি দিয়ে দেয়াটা ঠিক হয়নি। অস্ট্রীয় সরকারও চাচ্ছিল না তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের একজনকে এভাবে হারাতে। তারাও বোল্টস্‌মানকে বোঝাতে শুরু করেছিল।

এই চাপ তাকে মানসিকভাবে আরও অস্থির করে তুলেছিল। তিনি মার্চে বার্লিনকে চিঠি লিখে জানান যে, চোখের সমস্যার কারণে বার্লিনের পদটিতে ঠিকমত কাজ করা তার পক্ষে কষ্টকর হবে। কিন্তু সেখান থেকে জবাব আসে, এ নিয়ে তার চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। অগত্যা তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি এই পদটির জন্য যোগ্য নন:

বার্লিনের পদটি গ্রহণ করলে আমাকে সম্পূর্ণ নতুন একটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হবে, তা হচ্ছে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান। গত ১৫ বছরে আমি কেবল গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান, ব্যবকলনীয় এবং সমাকলনীয় ক্যালকুলাসের মৌলিক ধারণাগুলো পড়িয়েছি।… কিন্তু গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশদ অধ্যায়ই আমার অধরা রয়ে গেছে। বার্লিনে থাকার সময় আমার মনে হয়েছে, এখানে পড়ালে আমি নিজের এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার সুযোগ পাব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সম্পূর্ণ নতুন এই অধ্যায়টি শুরু করলে তা আমার চোখের জন্য ভাল হবে না। অপরদিকে, বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ ধারণা এবং অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এত দায়িত্বশীল একটি পদে যোগ দেয়াটা আমার বিবেকে বাধবে।

কিন্তু অন্য সূত্র থেকে জানা যায় বোল্টস্‌মান তার গবেষণা ক্ষেত্র নিয়ে সব সময়ই খুব ওয়াকিবহাল থাকতেন। তার এই লেখা থেকে বোঝা যায়, তিনি কারও প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন, সব সময় নিখুঁত হতে চাইতেন। যাহোক, অবশেষে ১৮৮৮ সালের ৯ই জুলাই জার্মান সম্রাট কাইজার ভিলহেল্ম ২ তাকে মনোনয়ন দিয়ে করা চুক্তিটি বাতিল করে দেন।

এসব ঘটনার পরই বোল্টস্‌মানের মধ্যে Neurasthenia (মনোগ্লানি) এবং চরম হতাশার লক্ষণ (বাইপোলার ডিসর্ডার) দেখা দিতে শুরু করে। তার জীবনের শান্তি ও সৌন্দর্য্যের দিন শেষ হয়ে আসে; হতাশা, অসন্তোষ এবং অস্থিরতা তাকে অধিকার করে নেয়। তিনি ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করতে থাকেন এই আশায় যে, হয়ত নতুন স্থানে শান্তি মিলবে। যেহেতু বার্লিন নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, সেহেতু গ্রাৎসে থাকতে তার অসুবিধা থাকার কথা ছিল না। কিন্তু বাইপোলার ডিসর্ডার তার মনের মধ্যে হাজারো দ্বিধা তৈরি করে। বার্লিনকে কেন না বলেছিলেন তা তিনি নিজেই জানতেন না। আর গ্রাৎসে ফিরে আসার পর মনে হচ্ছিল, তিনি কি আর সেই মহান বিজ্ঞানী নেই? নিজের বিখ্যাত এবং মহান সত্তাটির সাথে গ্রাৎসের নিজেকে তুলনা করে কষ্ট পাচ্ছিলেন।

এই অস্থিরতা এবং হতাশার মধ্যেই ১৮৮৯ সালে তার ছেলে লুডভিগ মাত্র ১১ বছর বয়সে অ্যাপেন্ডিসাইটিস জনিত জটিলতায় মারা যায়। আরও ভয়াবহ হচ্ছে, তিনি এই মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করতেন। তিনি মনে করতেন, রোগের ভয়াবহতা বুঝতে না পারা এবং ভুল ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কারণেই তার ছেলে মারা গেছে। এই মৃত্যু তার হতাশা ও মানসিক রোগে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন এবং একা থাকতে শুরু করেন।

[টু বি কন্টিনিউড…]

9 Comments

  1. আমরা অপরাজিত April 21, 2015 at 11:31 pm - Reply

    খুব ভাল একটি কাজে হাত দিয়েছেন।
    চলুক……।

  2. দীপেন ভট্টাচার্য April 22, 2015 at 12:54 pm - Reply

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। বোলৎজমানের ওপর বাংলা ভাষায় লেখাই নেই প্রায়। এখানে মনের অনেক খোরাক আছে।

    একটি প্রশ্ন – আপনি লিখেছেন,
    “১৮৭৫ সালে বোল্টস্‌মানের প্রথম বিখ্যাত গবেষণাপত্রের সেই সমীকরণটি তার বন্ধু লশমিটের সমালোচনার মুখে পড়ে। এ বিষয়ে লশমিটের বক্তব্য অপ্রত্যাবর্তন হেঁয়ালি বা লশমিটের হেঁয়ালি (Loschmidt’s paradox) নামে পরিচিত। বোল্টস্‌মান এই সমালোচনার জবাবও দিয়েছিলেন।”

    এটি কি বোলৎজমানের H থিওরেম যেখানে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে সময়ের সাথে যে কোনো গ্যাসীয় সিসটেম ম্যাক্সওয়েলের বিন্যাস (distribution) ধারন করে বা সেই সিসটেমের এনট্রপি বেড়ে যায়? লশমিট বোধহয় বলতে চেয়েছিলেন নিউটনীয় গতিতত্ত্ব যদি সময়ের সাথে প্রতিসম (বা symmetric) হয়, তবে সিসটেমের এনট্রপি বাড়তেও পারে। এই হেঁয়ালির অনেক উত্তর দেয়া হয়েছে, বোলৎজমানও দিয়েছেন, কিন্তু অদ্যাবধি কোনোটিই বোধহয় পুরোপুরি satisfacory নয়। কি মনে হয়?

    • শিক্ষানবিস April 22, 2015 at 9:03 pm - Reply

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। বোল্টস্‌মানের উপর বাংলায় খুব একটা লেখা নেই বলেই এটা লেখার উৎসাহ পেয়েছিলাম।

      হ্যাঁ, ওখানে এইচ উপপাদ্যের কথাই বলছিলাম। কিন্তু আমি নিজেও ব্যাপারটা সহজ করে লিখতে পারার মতো ভালো বুঝি না বলে বিস্তারিত লিখিনি। তবে এখন লেখাটা এডিট করে ঐ জায়গাতে এইচ উপপাদ্যের কথা যোগ করলাম, এবং একটা রেফারেন্সও দিলাম। কের্চিনিয়ানি’র যে বই অনুসরণ করে এটা লিখেছি তাতে ৫ম অধ্যায় পুরোটাই এইচ উপপাদ্য এবং লশমিট ও জেরমেলো’র হেঁয়ালি নিয়ে। কিন্তু সে পর্যন্ত এখনো যাইনি। তারপরও কের্চিনিয়ানি’র বইটি অনুসরণে এ ব্যাপারে আরেকটু বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করছি। আমি নিজে এখনো ভাল করে বুঝি না বলে নিজ থেকে কিছু বলার ঝুঁকি নিচ্ছি না। 😀

      এইচ উপপাদ্য
      ১৮৭২ এর গবেষণাপত্রে বোল্টসমান বলেন একটি আবদ্ধ সিস্টেমের E সর্বদা কমে। পরবর্তিতে E কে H দিয়ে প্রকাশ করা হয় এবং এই উপপাদ্যের নাম হয় H উপপাদ্য। H হলো এনট্রপির বিপরীত; তার মানে আবদ্ধ সিস্টেমের এনট্রপি সর্বদা বাড়ে। এনট্রপি বাড়তে বাড়তে বা এইচ কমতে কমতে যখন সর্বোচ্চে বা সর্বনিম্নে পৌঁছায় তখন সিস্টেমে সাম্যাবস্থা আসে, এবং তাতে ম্যাক্সওয়েল বণ্টন প্রতিষ্ঠিত হয়।

      লশমিটের হেঁয়ালি
      এইচ সর্বদা কমে, তার মানে এটা একটা অপ্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়া, যাকে উল্টো দিকে ঘুরানো সম্ভব না, এইচ কে কখনোই বাড়ানো সম্ভব না। কিন্তু গ্যাসের অণুগুলো যদি নিউটনীয় অর্থাৎ চিরায়ত বলবিদ্যা অনুসরণ করে তাহলে তারা অপ্রত্যাবর্তী হতে পারে না, কারণ সময়ের দিক থেকে নিউটনের সমীকরণ একেবারে প্রতিসম, সময় সামনে বা পিছনে যেদিকেই নেয়া হোক না কেন তাদের রূপ একই থাকে। লশমিট ১৮৭৫ এ এই কথা বললেও W. Thomson ১৮৭৪ সালেই এমনটা বলেছিলেন:

      the instantaneous reversal of the motion of every moving particle of a system causes the system to move backwards, each particle of it along its old path, and at the same speed as before, when again in the same position. That is to say, in mathematical language, any solution remains a solution when t is changed into —t.

      লশমিট বললেন, ক্ষয়িষ্ণু এইচ এর দশা যদি প্রকৃতিতে থেকে থাকে তাহলে কাল-প্রতিসাম্যের কারণে বর্ধিষ্ণু এইচও থাকবে।
      জবাবে বোল্টসমান স্বীকার করেছিলেন যে, বর্ধিষ্ণু এইচ দশা তাত্ত্বিকভাবে অবশ্যই থাকতে পারে, কিন্তু তিনি বলেছিলেন এদের ঘটার সম্ভাবনা এতই বিরল যে বাস্তবে তা কখনো পাওয়া যায় না। এরও সমালোচনা রয়েছে।

      পোয়াঁকারে-জের্মেলো হেঁয়ালি
      এইচ উপপাদ্যের বিরুদ্ধে আরেকটি আপত্তি। নিট্‌শে বলেছিলেন, বিশ্বের কোনো সমাপ্তি থাকতে পারে না, কারণ যদি থাকত তাহলে সেই সমাপ্তি এতদিনে এসে যেত; সুতরাং বিশ্ব যেহেতু অনন্তকাল ধরে থাকবে সেহেতু তাকে প্রতিটি ঘটনা অসীম সংখ্যক বার ঘটিয়ে যেতেই থাকতে হবে। অবশ্যই এটা অনেক আগের কথা, এবং একটা দার্শনিক কথা। পোয়াঁকারে প্রথম এরকম অনন্ত পুনরাবৃত্তির ধারণা তাপগতিবিদ্যার প্রেক্ষিতে বলেন:

      The world, according to them, tends at first toward a state where it remains for a long time without apparent change; and this is consistent with experience; but it does not remain that way forever, if the theorem cited above is not violated; it merely stays there for an enormously long time, a time which is longer the more numerous are the molecules. This state will not be the final death of the universe, but a sort of slumber, from which it will awake after millions of millions of centuries.

      ইংরেজ গতিতত্ত্ব ও বোল্টসমান বলছিল: যেকোনো আবদ্ধ ব্যবস্থা একসময় সাম্যাবস্থায় পৌঁছাবে যেখানে তার এনট্রপি সর্বোচ্চ, এবং এরপর তার তেমন কোনো পরিবর্তন অসম্ভব। কিন্তু পোঁয়াকারে মহাবিশ্বের এই থেমে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেন, সাম্যাবস্থার পর আর কোনো পরিবর্তন হয়ত খুবই অসম্ভাব্য, কিন্তু অসম্ভব নয়। জেরমেলো এই কথা দিয়ে বোল্টসমানের এইচ উপপাদ্যের বিরোধিতা করেন, তার মতে এইচ অপ্রত্যাবর্তীভাবে কমতে কমতে সর্বনিম্নে যেতে পারে না; মহাবিশ্ব এমন নয়।
      বোল্টসমান জবাবে পোঁয়াকারে’র কথা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা ছিল, সেই সাম্যাবস্থা থেকে তার আগের দশায় ফিরে যাওয়ার যে পরিমাণ সময় দরকার তা ভয়াবহ বড়, এবং সেটা আসলেই অতি অতি অসম্ভাব্য, এবং সেটা বোল্টসমানের এইচ উপপাদ্যকে অপ্রমাণ করে না। (সূত্র: কের্চিনিয়ানি’র বই, টীকা ১)

      এসব নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে বুঝতে পারছি। আসলেই। আরো পড়ব, এবং ভবিষ্যতে আরো লিখব। আমি এখনো এসব শেখার চেষ্টায় আছি। আপনি যদি কিছু লিখতেন তাহলে আরো ভাল হতো।

  3. মুগ্ধ..

  4. দীপেন ভট্টাচার্য April 23, 2015 at 12:41 pm - Reply

    @শিক্ষানবিস, আপনার বিস্তারিত উত্তরের জন্য ধন্যবাদ। ব্যাপারটা ঝামেলারই বলতে হবে 🙂 যে কোনো সিস্টেমের স্বাভাবিক সাম্য অবস্থা যদি সর্বোচ্চ এনট্রপী হয় তবে বিগ ব্যাং হবারই কথা নয়, কারণ বিজ্ঞানীদের ধারণা বিগ ব্যাং একটা সর্বনিম্ন এনট্রপী অবস্থা এবং তার পরে থেকে এনট্রপী বাড়ছে। কাজেই সময় যদি অসীম হয় অতীত ও ভবিষ্যতে, তবে মহাবিশ্ব একটা তাপীয় সাম্যবস্থায় (thermal equlibrium) আসবে যেখানে বস্তুর ঘনত্ব খুবই কম, বলতে গেলে শূন্য। সেখানে বিগ ব্যাং পূরবর্তী অতি-ঘন অবস্থার সৃষ্টি কেমন করে হবে? ইদানীংকালে দেখছি অনেকেই fluctuation theormএর ওপর জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ অতি উঁচু এনট্রপী অবস্থা থেকেও হঠাৎ হঠাৎ fluctuationয়ের ফলে কোন সিস্টেম নিম্ন এন্ট্রপীতে পতিত হতে পারে যেমন আমাদের মহাবিশ্ব বিগ ব্যাং পূরবর্তী অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেছিল।

    এই সম্বন্ধে আপনি লিখছেন,
    “বোল্টসমান জবাবে পোঁয়াকারে’র কথা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা ছিল, সেই সাম্যাবস্থা থেকে তার আগের দশায় ফিরে যাওয়ার যে পরিমাণ সময় দরকার তা ভয়াবহ বড়, এবং সেটা আসলেই অতি অতি অসম্ভাব্য, এবং সেটা বোল্টসমানের এইচ উপপাদ্যকে অপ্রমাণ করে না।”

    সময়টা ভয়াবহ বড় হতে পারে, তবে fluctuationয়ের ফলে অনেকটা অসীম সময়ের পরে তাপীয় সাম্যাবস্থা (প্রায় শূন্য ঘনত্ব) থেকে মহাবিশ্ব খুব ঘন একটা অবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে। Sean Carroll তার From Here to Eternity বইটিতে এই ধরণের একটা polemicsয়ের অবতারণা করেছিলেন বলে মনে হয়।

    আপনি যদি এই লেখাটা কোনদিন বই হিসেবে বের করেন, তবে সেখানে আপনার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার অবকাশটি যেন থাকে। সেই চিন্তায় অনেক সময় ভুল হতে পারে, কিন্তু পাঠকের কাছে সেটা অভিনবত্ব নিয়ে আসে। সেখানেই সেই বইটির মূল্য। আবারো আপনাকে এই বিষয়ে লেখার জন্য (এবং আমাকে লেখার আহ্বানের জন্যা) ধন্যবাদ জানাই। পরের অধ্যায়টির অপেক্ষায়।

    • শিক্ষানবিস April 23, 2015 at 6:51 pm - Reply

      বুঝলাম যে, আধুনিক বিশ্বতত্ত্বে এইচ উপপাদ্যের সমালোচনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহাবিস্ফোরণের সাথে সম্পর্কটাও আকর্ষণীয় মনে হলো। ক্যারলের ব্লগ প্রায় নিয়মতিই পড়ি। From Here to Eternity বইটা পড়ব পড়ব করেও এযাবৎ পড়া হয়নি। এবার পড়ে ফেলার আগ্রহ পেলাম।

      আপনি যদি এই লেখাটা কোনদিন বই হিসেবে বের করেন, তবে সেখানে আপনার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার অবকাশটি যেন থাকে। সেই চিন্তায় অনেক সময় ভুল হতে পারে, কিন্তু পাঠকের কাছে সেটা অভিনবত্ব নিয়ে আসে। সেখানেই সেই বইটির মূল্য।

      এই কথাটা সাহস দিল কিছুটা। আসলে নিজের কথা লিখতে সংকোচের কারণেই আমি অধিকাংশ সময় অনুবাদের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখি অনেক সময়। তবে নিজের চিন্তাধারা (তাতে ভুল থাকলেও) প্রকাশের উৎসাহটা দিনদিন বাড়ছে, আপনি বলার পর আরো বাড়ল।

  5. তানভীর April 24, 2015 at 4:43 am - Reply

    ম্যাক্সওয়েল, প্লাঙ্ক, আইনস্টাইন এদের সম্পর্কে যত লেখা চোখে পড়ে বোল্টসম্যানকে নিয়ে সে তুলোনায় তেমন কিছুই দেখি না। যদিও রসায়ন আর পদার্থবিজ্ঞান কিছুদূর পড়লেই বোঝা যায় যে কতখানি অবদান আছে বোল্টসম্যানেরও। আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্বে পদার্থবিজ্ঞানে যে সম্ভাব্যতা আর পারিসাংখ্যিক পদ্ধতির জয়জয়কার সেটার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বোল্টসম্যান। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা জেনারেল রিলেটিভিটির সমীকরণগুলো সময়ের গতি ধনাত্বক বা ঋণাতক উভয়ের জন্যই বৈধ কিন্তু বাস্তব জগতে সময়কে আমরে শুধু একদিকেই প্রবাহিত হতে দেখি। এই ব্যাপারটা আজকাল তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সাহায্যেই ব্যাখ্যা করা হয়। সেক্ষেত্রে এটমগুলো যদিও বলবিদ্যার নিয়ম মেনে ছোটাছুটি-মিথোস্ক্রিয়া করছে। তাদের সম্মিলিত ছোটাছুটির ফলে উদ্ভুত এন্ট্রপি স্রেফ এটমগুলোর স্থানিক গতির একটা পারিসাংখ্যিক বহিপ্রকাশ নয় বরং আরো মৌলিক কিছু হয়ে দেখা দেয়। আমার তো মনে হয় ভবিষ্যতের নতুন পদার্থবিজ্ঞানে এই তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে মৌলিক মূল সূত্র ধরে তার সঙ্গে আরো কিছু স্বতসিদ্ধ যোগ করে সেখান থেকেই অ্যাটমের ধারনাটা প্রতিপাদিত হবে। অর্থাৎ সেই নতুন তত্ত্বে এটম নিজে মৌলিক ধারণা হবে না, বরংআরো মৌলিক কোনো ভৌত নিয়মের একটা কোয়ান্টাইজড বহিপ্রকাশ হবে। ইন ফ্যাক্ট এর একটা আভাস আমরা ইতোমধ্যেই পাচ্ছি, কেননা কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী ‘কণিকা’ জিনিসটা আসলে কোয়ান্টাম সম্ভাব্যতা বিস্তারের তরঙ্গ সমীকরণের একটা বিশেষ রূপ। এ ধরনের অ্যাপ্রোচে কোয়ান্টাম ইনফরমেশন থিওরির কিছু ফাউন্ডেশনাল কাজও হচ্ছে আজকাল।

  6. প্রদীপ দেব April 25, 2015 at 12:49 pm - Reply

    খুবই কঠিন এবং ভালো কাজ।
    বৈজ্ঞানিক আলোচনা চলুক।
    লেখা চলুক।

  7. তানবীরা May 2, 2015 at 12:38 am - Reply

    খুব ভাল লাগলো। খুব আকর্ষনীয় করে লিখেছো, মুগ্ধ … পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়

Leave A Comment