আমাদের বাড়িতে মশার প্রচণ্ড উত্পাত। খুব মন দিয়ে একটা গবেষণামূলক বই পড়ছি- মশা এসে পায়ের পাতায় ড্রিল করা শুরু করলো। বুঝলাম, বই পড়া মানুষ মশাদের পছন্দ না। হেঁটে হেঁটে খুব গভীর কিছু চিন্তা করছি- কয়েকটা মশা এসে সামনে পিছে ঘুরঘুর করতে লাগলো। যেন মুখ দেখে বুঝে ফেলতে চাইছে কোন কুফরী চিন্তায় মগ্ন আছি। ফেসবুকে টাইপ করছি, এমন সময় একটা মশা এসে ঘাড়ের উপর নিজের চাপাতি ঢুকিয়ে দিলো। উফ! অসহ্য। এভাবে আর কত? ঘুমানোর সময়ও শান্তি নাই- কানের কাছে এলার্ম ঘড়ির মতো ভো ভো শব্দ করে জাগিয়ে তুলতে চায়, হয়তো ফজর নামাজ পড়ার জন্য। আমার কিছুই তো আমার মতো থাকছে না। ওদের মেনে নিয়ে আমি আমার মতো থাকবো কী করে?

বাড়ির মুরুব্বিরা বলতে লাগলেন বিছানায় মশারি টাঙিয়ে তার ভেতর সব কাজ করতে। আমি রাজি হলাম না। মশাদের কারণে কেন নিজের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করতে হবে? আবদ্ধ হয়ে যে আমি সে আমি কি ফুল হয়ে ফুটি? নাকি অঙ্কুরে ঝরে যাই? আসলে বেঁচেই থাকি, বিকশিতও হতে পারি চাইলে, তবে ফুল হই না। ফুল না হলে সুগন্ধ কোন কাজের? অথবা আমি মল হবো। মল না হলে দুর্গন্ধ কোন কাজের? সফল বা ব্যর্থ আমায় হতে হবে। এর বাইরে মানুষের কোনো অভিগম্য থাকতে পারে না।

আমাকে ছোটোবেলা থেকে মুরুব্বিরা বলেছে, গুরুজনে করো নতি। নতি করতে করতে আমার ঘাড় লক হয়ে যাচ্ছিলো। আমি শুয়োর হয়ে যাচ্ছিলাম- ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশ দেখতে পারছিলাম না। কিছু মানুষ আমাকে আকাশ দেখাতে গিয়ে মরে গেছেন। থাক সেসব, গল্প চলুক-

আমি এরোসল কিনে আনলাম, কয়েল আনলাম। কিন্তু মনে পড়লো নিজেরই দর্শন- হত্যা করা নিরুপায়ের কাজ। তারপর নতুন উপায় আবিষ্কার করলাম: প্রতিদিন গোধুলির সময় হলে দুই তিনটা কয়েল
জ্বালিয়ে দরজা জানালা খুলে দিই। মশারা কষ্ট পেয়ে বেরিয়ে যায়। মরে না ওরা, তবু আমার খারাপ লাগে। আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করলে আমি কি ওদের তাড়াতাম? মিলেমিশে থাকা যেতো নাকি? যেতো না। ওরা নিরুপায়, ওরা তাড়িত। ওদের রক্তে মিশে রক্তের নেশা। হয়তো আমাদেরও। জীবকে সম্যকরূপে বুঝি না আমি। কেউ বুঝেছে এমনটাও মনে করি না। তবে বুঝি, জীবসত্তার ঊর্দ্ধে উঠে মানুষ হতে হয়। কিন্তু কেউ মানুষ হয়েছে এমনটাও খুব দেখি নাই।

এমনতাবস্থায় মশারা এক নীতিনির্ধারণী সভার আয়োজন করেছে। সভায় তারা দলে দলে যোগ দিচ্ছে। গণ্যমান্যরা বক্তৃতা করছে। দিকে দিকে মশাবাহিনীর পতাকা উড়ছে পতপত পতাপত। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত আকাশ। আমার ঘরের দেয়াল কেঁপে কেঁপে উঠছে; ভয়ে পলেস্তারা খসে পড়ছে। মশারা ক্ষোভে দুঃখে জিহাদি জোসে চিৎকারে শীৎকারে নিজেদের ক্রপ ফাটিয়ে ফেলছে- “এতই যদি ভয়, তাহলে মশারির আড়ালে থাকলেই হয়। খোলামেলা ঘুরবা, আবার মশার কামড়ও সহ্য করবা না- এ কেমন কথা?”

সভার প্রধান বক্তা বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়েছেন-“ভাইসব, এরা আসলে মানুষ না, এরা মশাবিদ্বেষী। এইচআইভি ভাইরাসের কারণে এইডস হয়া কত মানুষ মরতাছে আফ্রিকায়- এরা এটা নিয়া কোনো কথা কয় না। গেরামে গঞ্জে সাপের কামড়ে কত মানুষ মারা যায়- এরা কেন সাপের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না? পাগলা কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হয়া ও মানুষ মরে- অথচ এরা কিছুই করে না।” বক্তার গলার স্বর আকাশ ফাটিয়ে ফেলছে, বাতাসের গতিপথ পাল্টে দিচ্ছে। “শুধু মশার বিরুদ্ধেই এরা লেগে আছে কেন? মশার মতো শান্তিপ্রিয় জীব ধ্বংস করতেই এরা তত্পর কেন? কারণ এরা আসলে মশাবিদ্বেষী। মশেশ্বরের দুনিয়ায় এদের বেচে থাকার অধিকার নাই। এসব মশাবিদ্বেষীকে আমরা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া দিয়া ধ্বংস করে দিবো . . .

শ্লোগান উঠতে থাকে ‘জয় মশেশ্বরের জয়’ ‘মশেশ্বর জিন্দাবাদ’ ‘মানুষদের কতল করো’ ‘মশাবিদ্বেষী খতম করো’। বক্তব্য-শ্লোগান রাতভর চলতে থাকে। ভিডিও হতে থাকে। পরদিন সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউব ফেসবুক টুইটারে। সারাদেশের মশারা উত্তপ্ত উন্মাদ হয়ে ওঠে। দিকে দিকে সাড়া পড়ে যায়। অমুক সংঘ তমুক দলের সংহতি প্রকাশের খবর আসতে থাকে একটু পর পর। অনুভূতি শক্ত খাড়া হয়ে গেছে; গরম গরম আন্দোলন নি:সৃত হচ্ছে সাঁই সাঁই করে।

প্রচুর জনসমর্থন পেয়ে যায় মশারা। ঠিকই তো, একদম মোক্ষম যুক্তি দিয়েছে! মাছিসমাজ একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানায় যে তারা মশাদের সাথে সমব্যথী; মশাদের আন্দোলনে তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবে। দ্বিগুণ উত্সাহ নিয়ে মানুষের খাদ্য দুষিত করবে তারা। মানুষেরই মলে চষে বেরিয়ে মানুষেরই খাদ্যে বিশ্রাম নেবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মাছিরা যখন খোলা পাতে বসে তখন তাদের পিষে মেরে ফেলা হয় বা হত্যার চেষ্টা করা হয়। এর বিরুদ্ধে সারাদেশে ঐকমত্য সৃষ্টি করতে হবে। মানুষেরা কেন পাতে ঢাকনি দেবে না? খোলা পাতে তো মাছি বসবেই, কারণ তারা মাছি।

আমার ক্লান্তি আসে। আমি শুয়ে পড়ি। আমার দেশের মানচিত্রটা চোখে ভাসে- এক পা হারানো মানুষের মতো কি? আচ্ছা পা না থাকুক, মাথা কি আছে? নাই। খালি আছে অনুভূতি। জন্মের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ তার মাথাটাকে প্রতিস্থাপিত করে ফেলেছে অনুভূতি দিয়ে। চোখ লেগে আসে। দু:স্বপ্ন দেখি:

সবাই বুকের ভেতর মাখন নিয়ে ঘুরাফিরা করছে। বুকের মাখন বড় স্পর্শকাতর। তোমার আদিপিতা নিম্নতর কোনো জীব- এ জাতীয় কথায় বুকের মাখনে ধুন্দুমার আঘাত লেগে যায়। বুকের মাখন অপমানে কুঁকড়ে যেতে থাকে অ্যামিবার মতো। বুকের মাখন নির্লজ্জ- আদিপিতাদের আদিমামা ভাবতেও লজ্জা পায় না। বুকের মাখন কাপুরুষ- সাগর থেকে বয়ে আসা মুক্ত বাতাস- মুক্তির বাতাসকে ভয় করে, হিমালয়ের শৈত্যপ্রবাহকে ভয় করে। মানুষগুলা বাতাস দেখলেই পিঠ দেখিয়ে দাঁড়ায়, এতে বুকের মাখন রক্ষা পায়। কিন্তু বসন্তকালে রক্ষা নাই। বসন্তের বাতাস নিজেও জানে না সে কোনদিক থেকে আসবে। তেরো সালে তেমন এক বসন্ত এসেছিলো।

বসন্ত হচ্ছে শয়তানের কাল। রং দেখে বুকের মাখন কাঁদে, যেমন গল্পের বইয়ের ভূত আলো দেখে কাঁদে। বুকের মাখন হীনম্মন্য, কারণ সে পচে গেছে। বুকের মাখন হীনম্মন্য, তাই সে নিষ্ঠুর। গাছের আগুন দেখে বুকের মাখন উত্তেজিত হয়- ধ্বংসের উত্তেজনা। গাছে কেন সুন্দর আগুন ফুটলো- একে ধ্বংস হতে হবে! বসন্তের বাতাস এলোমেলো- বুকের মাখনকে নানাদিক থেকে আক্রমণ করে বসে। তাই একদিন প্রত্যুষের প্রার্থনা শেষে বুকের মাখন ঝকঝকে চাপাতি হয়ে যায়।

By | 2015-04-10T23:26:17+00:00 April 5, 2015|Categories: গল্প|4 Comments

4 Comments

  1. মাজ্‌হার April 5, 2015 at 7:26 pm - Reply

    অনেক চমৎকার হয়েছে। সত্যিই অসাধারণ সত্য বলার এই গল্প…

    বসন্ত আবার আসবে। 🙂

  2. ধন্যবাদ পড়ার জন্য। নিশ্চয়ই আসবে বসন্ত।

  3. তানবীরা April 6, 2015 at 12:42 am - Reply

    মুগ্ধ … চমৎকার … অসাধারণ

  4. লাবিব ওয়াহিদ April 6, 2015 at 12:56 am - Reply

    তানবীরা, ধন্যবাদ।

Leave A Comment